হরমুজ প্রণালিতে হামলা, বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম
বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ৩:২৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। গত মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলার ছাড়িয়ে গত পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে ধারাবাহিক হামলার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়েছে।
গত মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ২৭ ডলারে ওঠে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ২ শতাংশ বেড়ে ১০০ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছায়। তবে দিনের পরবর্তী সময়ে দুই ধরনের তেলের দাম কিছুটা কমে যথাক্রমে ১০৯ দশমিক ২৭ ও ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে নেমে আসে।
চলতি বছরের মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে উঠেছিল। তবে জুনের শেষ দিকে তা কমে ৭৩ ডলারে নেমে আসে। এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করে। কিন্তু জুলাই থেকে ওই অঞ্চলে আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকায় সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
পারস্য উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসায় বিশ্ববাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘ সময় তেলের দাম বেশি থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচেও চাপ তৈরি হতে পারে।
তেল সরবরাহে নতুন করে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে সৌদি আরবকে ঘিরেও। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে চলমান সংঘাত এ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। হুতিদের হামলার পরিধি বিভিন্ন অবকাঠামোর পাশাপাশি শাইবাহ তেলক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে সৌদি আরবের কয়েকটি এলাকায় তেল উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশ্ববাজারের তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, তেলবাহী ট্যাংকারে ধারাবাহিক হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি প্রায় যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। কিন্তু নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় সরবরাহ আবারও কমে গেছে।
গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুতে পারস্য উপসাগর থেকে দৈনিক গড়ে তেল সরবরাহ কমে ৮৫ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও এই সরবরাহের পরিমাণ ছিল দৈনিক দুই কোটি ব্যারেলের বেশি।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজির বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সঙ্গে ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ট্যাংকারের ভাড়া রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিও বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষক ওয়ারেন প্যাটারসন ও ইওয়া মান্থের মতে, তেল সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে যুদ্ধের কারণে দামের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত মূল্য ধীরে ধীরে কমে আসত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
তেল পরিবহনের ব্যয় কমাতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু ট্যাংকার বিক্রির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার তেল পরিবহনে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেসব ট্যাংকার ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সাধারণত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নামে পরিচিত। এসব জাহাজ প্রচলিত পশ্চিমা জাহাজ চলাচল ও বীমাব্যবস্থার বাইরে থেকে তেল পরিবহন করে।
যুক্তরাষ্ট্র এসব ট্যাংকারের কিছু বিক্রির অনুমতি দিলে সেগুলো বৈধ বাজারে ফিরে আসার সুযোগ পেতে পারে। এতে তেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ট্যাংকারগুলো বাজারে যুক্ত হলে পরিবহন সক্ষমতা কতটা বাড়বে এবং এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কত দ্রুত কমতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং তেল পরিবহনের পরিস্থিতির ওপরই আগামী দিনে বিশ্ববাজারের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সূত্র: অয়েলপ্রাইস ডটকম
১৭০ বার পড়া হয়েছে