সর্বশেষ

সারাদেশ

সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলায় পৌরসভার রাজস্ব ফাঁকি, দৈনিক লাখ লাখ টাকার হরিলুট

স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা
স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা

বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১:৪০ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
সাতক্ষীরার প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা ঘিরে উঠেছে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ। দোকান বরাদ্দ, দৈনিক ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচের নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে। নাগরিক নেতাদের দাবি, মেলায় প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ টাকা আদায় হচ্ছে। অথচ পৌরসভার মালিকানাধীন শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে মেলা বসানো হলেও কোনো রাজস্ব পায়নি সাতক্ষীরা পৌরসভা। মেলার অর্থ আদায়, ইজারা ও ব্যবস্থাপনায় কারা যুক্ত, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।

সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা এবার বড় বাণিজ্যিক আয়োজনে পরিণত হয়েছে। মেলায় দোকান বসানো থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও অন্যান্য খরচের নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মেলার সঙ্গে নড়াইলের আওয়ামী লীগ নেতা মানিক শিকদারের ছেলে হাসান শিকদারের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

মেলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অনুযায়ী, দোকানের শ্রেণিভেদে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। এর বাইরে বিদ্যুৎ বিল বাবদ দৈনিক ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ইটের জন্য ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। দোকান স্থাপনের জন্য ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।

মেলায় স্টল নেওয়া জুঁই হানি ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাহিদা আক্তার বলেন, তাঁবুর জন্য ৭ হাজার, সাজসজ্জার জন্য ৯ হাজার এবং ইটের জন্য ৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে তাঁকে। এ ছাড়া প্রতিদিন ১ হাজার ৬০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। তিনটি বাতির জন্য প্রতিদিন দিতে হচ্ছে আরও ৩০০ টাকা। শৌচাগার ব্যবহারের জন্য প্রতিবার ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মেলার আচার ও চাটনির দোকানি আব্দুস সামাদও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, তাঁবুর জন্য ২০ হাজার এবং সাজসজ্জার জন্য ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মোট ৩০ হাজার টাকা অফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে প্রতিদিন ৪ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। পাঁচটি বাতির জন্যই প্রতিদিন দিতে হয় ৫০০ টাকা।

ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা আদায় হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এ অর্থ আদায়ের সঙ্গে হাসান শিকদার ও মাহবুব শিকদার যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে মেলার মোট আয়, ব্যয় ও আদায় করা অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি।

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আলীনুর খান বাবুল বলেন, মেলার নামে গভীর রাতে জুয়ার আসর বসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মেলায় আসা নারী ও শিশুদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করার ঘটনাও ঘটছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, মেলা থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন খাতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আদায় হচ্ছে। এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।

মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, তাঁরা নড়াইলের আওয়ামী লীগ নেতা মানিক শিকদারের ছেলেকে মেলার ইজারা দেননি। খুলনার একজন ব্যক্তিকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। মেলায় বিভিন্ন স্টল নিয়ে আসা ব্যবসায়ীরা ওই ব্যক্তির সঙ্গে এসেছেন বলে জানান তিনি।

তবে হাসান শিকদার কীভাবে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য বা নথিপত্র নেই বলে জানান আবু জাহিদ ডাবলু। মেলার ইজারার মোট দর কত ছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, গুড়পুকুরের মেলা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে আয়োজন করা হচ্ছে। তবে ইজারার মোট অঙ্ক তাঁর জানা নেই।

অর্থ আদায় ও মেলার ব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাইলে হাসান শিকদার বলেন, ‘ওটা আমি জানি না ভাই, খরচখরচা বাদ দিয়ে যা থাকবে, তাই।’ তিনি জানান, সাধারণত এক মাস ধরে মেলা চলে। তবে এবার দেশের পরিস্থিতির কারণে সময় কমিয়ে ২০ দিন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এবার কোনো রকমে খরচ উঠছে এবং সবাই মিলে ঝুঁকি নিয়ে মেলার আয়োজন করছেন।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে হাসান শিকদার বলেন, তাঁর কোনো দলীয় পদ নেই। তিনি ব্যবসায়ী এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন।

সাতক্ষীরা পৌরসভার মালিকানাধীন শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে গুড়পুকুরের মেলা অনুষ্ঠিত হলেও এ আয়োজন থেকে এখন পর্যন্ত কোনো রাজস্ব পায়নি পৌরসভা। পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক পৌরসভার মালিকানাধীন জায়গা। বৃক্ষমেলা, স্থানীয় মেলাসহ বিভিন্ন আয়োজনের জন্য এ জায়গা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। বর্তমানে গুড়পুকুরের মেলাও সেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এ মেলা থেকে পৌরসভা এখন পর্যন্ত কোনো রাজস্ব আদায় করেনি বা পায়নি।

২০ দিনব্যাপী আয়োজন শেষে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা। তবে দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা খুলে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আয়োজকদের কিছুটা সময় দেওয়া হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, মেলার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে না। তবে স্থাপনা খুলে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য আয়োজকেরা সময় চেয়েছেন। এ কারণে তাঁদের ধীরে ধীরে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

মেলার অর্থ আদায়, ইজারার প্রকৃত অঙ্ক এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

১২১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০