সর্বশেষ

জাতীয়

বাংলাদেশের সামনে তিন চ্যালেঞ্জ: আইএমএফের সতর্কবার্তা  

ডেস্ক রিপোর্ট
ডেস্ক রিপোর্ট

সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২:৩২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে কর্মসংস্থানের পরিবর্তন—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ সভায় বাংলাদেশের জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো, জ্বালানি ভর্তুকির চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি পর্যালোচনায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আইএমএফ ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলা, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিশ্বের ১৯১টি সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সভায় সরকারি ঋণের চাপ, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম, কর্মসংস্থানের সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ, জ্বালানি ভর্তুকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়গুলোও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

সভা থেকে বাংলাদেশের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের বিষয় সামনে এসেছে। এগুলো হলো রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণ পরিশোধ ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা, জ্বালানি ও বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ সামলানোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা।

বাংলাদেশের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ঋণ বা সহায়তার প্রস্তাবকে অনুমোদিত অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো ঋণ বা আর্থিক সহায়তার প্রকৃত পরিমাণ, সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা, শর্ত এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া যাচাই করা জরুরি। একইভাবে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি কোন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তা মূল্যায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সম্মেলনে আইএমএফের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়ে যাওয়া। ঋণের দায় মেটাতে সরকারের ব্যয় বাড়লে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ কমে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও খাদ্যের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং অর্থনৈতিক নীতির প্রতি আস্থা ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় উঠে এসেছে।

বৈশ্বিক সংঘাত, বাণিজ্যপথে বিঘ্ন এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে। এ কারণে সংকট মোকাবিলায় সরকারি সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে জ্বালানি ভর্তুকির ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ভর্তুকিতে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তবে ভর্তুকি সংস্কারের সময় দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এবারের সভায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়েছে। এ প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং অনেক কাজ দ্রুত ও কম খরচে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করলেও প্রচলিত কিছু পেশায় কর্মীর চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে।

বিশেষ করে তরুণদের প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি এবং নিয়মিত কাজনির্ভর পেশাগুলো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। এ কারণে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রশিক্ষণ, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মীদের পুনরায় দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলা, ডিজিটাল জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। এসব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধে ব্যাংক অব থাইল্যান্ড, আইএমএফ ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের আলোচনায় ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’ গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন পদ্ধতি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন ১২০ কোটি তরুণ। অথচ একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে প্রায় ৪০ কোটি। ফলে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৮০ কোটিতে।

অজয় বাঙ্গা বলেন, চাকরি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি মানুষের মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত। উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সরকারি অর্থ, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য সহায়তা ও প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

যেসব খাতে বাজারভিত্তিক বিনিয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয়, সেখানে সরকারি ও স্বল্পসুদে অর্থায়ন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ থাকলে সেই পুঁজিকে কাজে লাগানোর ওপরও জোর দেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ অর্থবছরে তাদের উদ্যোগে বেসরকারি খাত থেকে উন্নয়ন অর্থায়ন সংগ্রহের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে তা বেড়ে ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। নিজস্ব অর্থায়নসহ বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মোট অর্থায়ন ২৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের আওতায় ইতিমধ্যে ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ পেয়েছেন।

একই সময়সীমার মধ্যে এক বিলিয়ন মানুষের পানির নিরাপত্তা উন্নত করা, ৩০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষককে উৎপাদন বাড়িয়ে উদ্বৃত্ত তৈরিতে সহায়তা করা এবং ১৫০ কোটি মানুষের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল তথ্যের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বাড়ানো, বড় ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষ করে সংঘাতপ্রবণ ও দুর্বল অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

সম্মেলনের সমাপনী পর্যায়ে আয়োজক দেশ থাইল্যান্ডের ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। থাই সরকারের মুখপাত্র একাপপব পিয়ানপিসেস জানান, সম্মেলনের আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতার প্রশংসা করেছেন জর্জিয়েভা। অংশগ্রহণকারীরা এ আয়োজন থেকে উপকৃত হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির চেয়ারম্যান এবং সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদানও আয়োজনের প্রশংসা করেন। থাইল্যান্ডের এ সম্মেলনে প্রায় ২০ হাজার অংশগ্রহণকারী যোগ দেন।

সম্মেলনে উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ লক্ষ্যে ছয়টি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যে বিনিয়োগ মূল্যায়ন ও অর্থায়ন হস্তান্তরের অভিন্ন পদ্ধতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন অজয় বাঙ্গা।

সব মিলিয়ে, এবারের বার্ষিক সভায় বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় নীতিগত অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। আইএমএফ গুরুত্ব দিয়েছে ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা সামনে এনেছে।

তবে সম্মেলনে আলোচিত উদ্যোগগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন ঋণ অনুমোদন বা অর্থ ছাড়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব উদ্যোগের বাস্তব ফল নির্ভর করবে দেশভিত্তিক সংস্কার, বিনিয়োগ বাস্তবায়ন এবং প্রতিশ্রুত অর্থায়ন কার্যকরভাবে পৌঁছানোর ওপর।

বাংলাদেশের জন্যও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, জ্বালানি ভর্তুকির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি অর্জনই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

১৩৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০