সর্বশেষ

সারাদেশ

অস্ত্রোপচারের পর বিথির মৃত্যু: ৫৫ হাজার টাকায় আপসের নথি ভাইরাল

আবিদ জামান, ফরিদপুর
আবিদ জামান, ফরিদপুর

সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ৩:০৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই দেওয়ার অভিযোগের পাঁচ মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিথি আক্তারের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে তাঁর স্বামীর সঙ্গে ৫৫ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে আপসের একটি নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তদন্তে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল বিথি আক্তারের চিকিৎসায়। ওই ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর গত ৮ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর স্বামী রাকিবুল ইসলামের ৫৫ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে আপসের একটি নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

নথিতে উল্লেখ রয়েছে, আর্থিক সহায়তা নেওয়ার পর ভবিষ্যতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া বা আর্থিক দাবি করবেন না রোগীর পরিবারের সদস্যরা।

বিথি আক্তার রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যোতিনবর্দিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী। তিনি ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করতেন।

গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিথির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন চিকিৎসক তামান্না আক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দু। ওই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন বিথি। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর পেটে গজ রেখে সেলাই করা হয়েছিল। এর পর থেকে তিনি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে থাকেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সমস্যার কথা জানানোর পরও গুরুতর কোনো সমস্যা নেই বলে তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

প্রায় দেড় মাস পর দুটি বেসরকারি হাসপাতালে দুই দফা আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষায় বিথির পেটে গজ কাপড় থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে ১২ জুলাই তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।

অসুস্থ হওয়ার দুই মাস নয় দিন পর ১৫ জুলাই তাঁর দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করা হয়। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হক শোভন ও সঞ্জয় সাহা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর পেট থেকে গজ বের করেন। তবে দীর্ঘদিন পেটের ভেতরে গজ থাকায় নাড়িতে পচন ধরে এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পরই বিষয়টি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসককে জানানো হয়। ওই রাতেই বিথির পরিবারের সঙ্গে আপস-মীমাংসা করা হয় বলে জানা গেছে। পরে ২২ জুলাই তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়।

তবে পেটের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত বিথি আবার ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৪ অক্টোবর তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে আটটায় তাঁর মৃত্যু হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নথিটি ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা। এতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৫৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া বা আর্থিক দাবি না করার শর্তও রয়েছে।

নথিতে বিথির স্বামী রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর দেখা গেলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে।

আপস-মীমাংসার বিষয়টি নিশ্চিত করে রাকিবুল ইসলাম বলেন, তাঁর স্ত্রী হাসপাতালে কাজ করতেন। ভবিষ্যতে সেখানেই ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে কাজ করাসহ চাকরির সুযোগের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। পাশাপাশি তখন তাঁর আর্থিক সংকটও ছিল।

রাকিবুলের ভাষ্য, স্ত্রীর জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তিনি আপসে রাজি হয়েছিলেন। তখন তিনি জানতেন না যে তাঁর স্ত্রী মারা যাবেন। এখন এ নিয়ে সবাই তাঁকে দোষারোপ করছেন, যা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তবে আইনি জটিলতা এড়িয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চান তিনি।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টাকা দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি শুনেছেন।

তিনি জানান, বিথির চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

বিথির চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান স্বপন কুমার বিশ্বাসকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের উপপরিচালক।

১৮৮৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০