কুষ্টিয়া মেডিকেলে রোগীর স্বজনদের মারধরের অভিযোগ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে
সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:৫২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ফেসবুকে প্রতিবাদমূলক পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই ভাইকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। শনিবার সন্ধ্যায় হাসপাতাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিরাপত্তার কারণে হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুকেও অন্যত্র নিয়ে গেছে তার পরিবার। ঘটনার পর পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ফেসবুকে প্রতিবাদ জানানোকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজন দুই ভাইকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। এ সময় তাঁদের একটি মোটরসাইকেল ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছে পরিবার। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে মুঠোফোন উদ্ধার হলেও মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায়নি।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া শহরের হরিশংকরপুর এলাকার রহমত আলীর ছেলে সোহাগ ও সোহেল এ ঘটনার শিকার হন। সোহেলের ছেলে নিউমোনিয়া ও রক্তের সংক্রমণজনিত সমস্যায় গত কয়েক দিন ধরে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, শনিবার সন্ধ্যায় সোহেল হাসপাতালে প্রবেশ করার পর ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী তাঁকে মারধর করেন। এ সময় ছোট ভাই সোহাগ তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা তাঁর দিকেও লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে যান। একপর্যায়ে সোহাগ হাসপাতাল চত্বরের বাইরে চলে যান। পরে বাইরে ডাব বিক্রির একটি দোকান থেকে হাসুয়া নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
পরিবারের দাবি, এ সময় সোহাগের মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল নিয়ে নেওয়া হয়। পরে পুলিশ মুঠোফোনটি উদ্ধার করলেও মোটরসাইকেলটি ফেরত পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে সোহেলের ছেলেকে হাসপাতাল থেকে অন্যত্র নিয়ে যায় পরিবার। আর গুরুতর আহত সোহেলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হয়। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে মৃত রোগীর ছেলেসহ তিনজনকে আটকে রেখে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। পুলিশ তাঁদের আদালতে পাঠায়।
ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন সোহাগ ও সোহেল। পরিবারের অভিযোগ, সেই পোস্টের জের ধরে শনিবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে প্রবেশের পর তাঁদের ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয়।
ঘটনার পর সোহাগ জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চান।
সোহাগের স্ত্রী মারিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, এর আগে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁর স্বামী ও ভাসুর ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। তাঁর ভাসুরের ছেলে ছয় দিন ধরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মারিয়া বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় তাঁর ভাসুর সোহেল হাসপাতালে প্রবেশ করার পর জরুরি বিভাগের ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁদের উদ্দেশে বলেন, ‘আজ রোগী মারা যায়, রোগী মারা যাবে, তুই পোস্ট করলি কেন, এসব পোস্ট করলি কেন?’ এরপরই মারধর শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মারিয়ার দাবি, মারধরে তাঁর ভাসুর গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় তাঁর স্বামীর মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল নিয়ে নেওয়া হয়। পরে মুঠোফোনটি ফেরত পেলেও মোটরসাইকেলটি এখনো পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য চম্পা খাতুন বলেন, তাঁর নাতি হাসপাতালে ভর্তি। তাঁর মেজো ছেলে সোহেল হাসপাতালে প্রবেশ করার পর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি ও বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে তাঁরা সোহেলকে মারধর করতে শুরু করেন এবং অন্য ছেলেকেও মারতে যান। তখন তিনি দৌড়ে পালিয়ে যান।
চম্পা খাতুন আরও বলেন, পরে লোকজনের কাছে জানতে পারেন, কয়েকজন মিলে তাঁর ছেলেকে মারধর করেছেন। মারধরের সময় মোটরসাইকেলের চাবি কেড়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁর ছেলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন তিনি।
মারধরের শিকার সোহাগ বলেন, ঘটনাস্থলে একজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ওই পুলিশ সদস্য তাঁকে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন। তিনি বলেন, তাঁর ছোট ভাই সোহাগ দৌড়ে পালিয়ে না গেলে তাকেও মারধর করা হতো। আগের রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিবাদ করায় তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ সময় হাসপাতাল এলাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতার কথাও জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা টিটু বলেন, মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক আচরণ এবং রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তুচ্ছ বিষয় নিয়েও অনেক সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে তিনি দাবি করেন।
টিটু বলেন, চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক আইন সহায়তা কেন্দ্রের (আসক) কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি তানভীর আহমেদ রয়েল বলেন, মেডিকেল কলেজটি চালুর শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের একাংশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক আচরণের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বিরোধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে বলে তিনি দাবি করেন।
তানভীর আহমেদ রয়েল আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের আচরণের কারণে রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা অনেক সময় অবহেলিত বোধ করেন। এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জনকে আগেও অবহিত করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তবে তাতে কোনো সুফল পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ তাঁর।
এ বিষয়ে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের ‘দালাল’ বলা হয়েছিল। তিনি বলেন, তিনি যতটুকু পেরেছেন, ভুক্তভোগী পরিবারকে সহযোগিতা করেছেন। পরিবার পরবর্তী সময়ে অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, অনেকগুলো ঘটনার রেশ ধরে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আগে থেকেই বিরোধ ছিল। শনিবার একজন চোর ধরা পড়েছিলেন। তাঁকে হাসপাতালের বাইরে কয়েকজন মারধর করলে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেন। সেখান থেকেই গোলযোগের সৃষ্টি হয় বলে জানান তিনি।
অধ্যক্ষ আরও বলেন, বর্তমানে মেডিকেল ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে পুলিশ।
১২২ বার পড়া হয়েছে