এক রুটে একাধিক নয়, ৬ মাসে ঢাকায় চালু হবে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৫:২৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো ও যানজট কমাতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ব্যবস্থায় প্রতিটি নির্ধারিত রুটে একটি কোম্পানির অধীনে বাস চলবে। পাশাপাশি কাউন্টারভিত্তিক যাত্রীসেবা, ই-টিকিটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিং চালু করা হবে। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ নির্মাণ এবং আগামী দুই মাসের মধ্যে অন্তত এক হাজার মাঠ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী দুই মাসের মধ্যে বাসের স্টপেজ নির্ধারণ, পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাস মেরামত এবং চালকদের মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি রুটে এ কার্যক্রম শুরু হবে। পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকার ৩২টি রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাসসেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে চালু থাকা বাস রুটগুলো পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে নিয়ে আসা হবে। প্রতিটি রুটে একটি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালিত হবে। এতে বাসের চলাচল, যাত্রী ওঠানামা ও টিকিট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সড়কে বাসের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীর একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচলের কারণে দীর্ঘদিন ধরে যানজট ও প্রতিযোগিতার সমস্যা রয়েছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে ২০১৫ সালে তৎকালীন সরকার একটি কমিটি গঠন করে। এর আগে ২০০৪ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর ঘাটারচর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ২৬ নম্বর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালু হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্স-সিলভা ও রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) যৌথভাবে এ সেবা পরিচালনা করে। নির্ধারিত কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্টপেজে ওঠানামার ব্যবস্থা ছিল। তবে একই রুটে চলাচলকারী অন্য কোম্পানির বাসগুলোকে এ ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব না হওয়ায় একপর্যায়ে কার্যক্রমটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যাত্রীছাউনিগুলোও অব্যবহৃত পড়ে থাকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বাস মালিকদের সাড়া না পাওয়ায় এ ব্যবস্থা কার্যকর করার উদ্যোগ সফল হয়নি। এবার নতুন করে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান বৈঠকে জানান, ঢাকায় অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে ৯৮টি চালু রয়েছে। এসব রুটে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাস চলাচল করছে। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় একই রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন কোম্পানির বাস একীভূত করে একটি কোম্পানির অধীনে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস মালিকেরা তাঁদের বিনিয়োগের অনুপাতে মুনাফা পাবেন। অন্যদিকে চালক ও শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরিবর্তে মাসিক বেতনে নিয়োগ দেওয়া হবে।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বাস চলাচল করবে এবং নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা করা যাবে না। একটি বাস অন্য বাসকে অতিক্রম করে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে না। যাত্রীদের সুবিধার্থে কাউন্টারভিত্তিক টিকিট, বৈদ্যুতিন টিকিটিং ও জিপিএসের মাধ্যমে বাসের অবস্থান শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে রুট ও বাসের স্টপেজ নির্ধারণ করা হবে। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে যেসব বাস মেরামতযোগ্য, সেগুলো মেরামত করা হবে। যেসব বাসের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল রয়েছে, সেগুলো চালু রাখা হবে। অন্য বাসগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী দুই মাসের মধ্যে কয়েকটি রুটে কার্যক্রম শুরু এবং ছয় মাসের মধ্যে পুরো ব্যবস্থাটি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে পরিবহন মালিকেরা রোববার থেকে কাজ শুরু করবেন। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে কোন দুটি রুটে প্রথমে এ সেবা চালু হবে, তা নির্ধারণের বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, গত ২৮ সেপ্টেম্বর বাস কোম্পানির মালিক ও সমিতির নেতাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই মাসের মধ্যে প্রস্তাবিত ৩২টি রুটে বাস চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে। ছয় মাসের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক সেবা চালু করা যেতে পারে।
ডিটিসিএ সমীক্ষার ভিত্তিতে রুট পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এ সমীক্ষায় ৫২টি স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়।
এর আগে ২০২১ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বাধীন কমিটি বাস রুট রেশনালাইজেশনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিল। তখন ২৪৬টি কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানি গঠন এবং ২৭৮টি রুট পুনর্বিন্যাস করে ২২টি রুট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। প্রতিটি কোম্পানির বাসের জন্য আলাদা রং নির্ধারণের পরিকল্পনাও ছিল। ওই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঘাটারচর থেকে মোহাম্মদপুর ও মতিঝিল হয়ে কাঁচপুর পর্যন্ত গ্রিন ক্লাস্টারের বাসসেবা চালু করা হয়েছিল।
বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিবহন মালিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ গড়ে তোলার নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত পৃথক এক বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। আগামী দুই মাসের মধ্যে সারা দেশে অন্তত এক হাজার খেলার মাঠ গড়ে তোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নে পর্যায়ক্রমে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ২৭টি জেলায় মাঠ নির্মাণের জন্য ৪০৩টি খাসজমি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি মাঠের আয়তন সর্বনিম্ন তিন বিঘা থেকে সর্বোচ্চ আট বিঘা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাঠগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত খেলাধুলা পরিচালনার জন্য প্রতিটি উপজেলায় একজন ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল ও ব্যাডমিন্টনসহ ১০ ধরনের খেলায় প্রায় ১৪ লাখ কিশোর-কিশোরীকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আগামী ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী খুলনা থেকে একযোগে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় এ ক্রীড়া কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এ ছাড়া আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪০টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯০টি মাঠ খেলাধুলার উপযোগী করে নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রম চালুর বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতি দুই থেকে তিনটি ওয়ার্ডের জন্য অন্তত একটি খেলার মাঠ নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
১২৬ বার পড়া হয়েছে