সরকারি দামের চেয়ে অনেক টাকা বেশি এলপিজি সিলিন্ডারে
রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:১৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার। রাজধানী ঢাকা, আশপাশের এলাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। সরবরাহে সংকটের কথা বলে অনেক বিক্রেতা সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখলেও সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে।
টঙ্গীর এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রেতা মো. মিঠু রহমানের ছোট দোকানে বিভিন্ন কোম্পানির সিলিন্ডার বিক্রি হয়। রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে ক্রেতা সেজে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে জানান, সিলিন্ডার নেই। পরে ‘গ্যাস না থাকায় বাসায় রান্না হচ্ছে না, যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে দেন’—এমন অনুরোধ করা হলে তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম চান ২ হাজার ৪০০ টাকা।
মিঠু রহমান বলেন, ‘সিলিন্ডার এমনিতেই নেই। দাম ২ হাজার ৪০০ টাকা দেবেন। দেখি যদি ম্যানেজ করে দিতে পারি। বিকেলে একবার ফোন দিয়েন।’
শুধু টঙ্গী নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। রোববার সকালে রাজধানীর আজিমপুর ও ধানমন্ডিসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে অনেক এলপিজি বিক্রির দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। আবার অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে সিলিন্ডার বিক্রি করা দোকানগুলোর অনেকগুলোতেও সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি।
আজিমপুরের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, ‘সিলিন্ডার দেওয়া যাবে, তবে ২ হাজার ৫০০ টাকা পড়বে। নতুন বোতলসহ কিনলে ৪ হাজার টাকা দিতে হবে।’
এলপিজি সিলিন্ডারের বাড়তি দাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্রেতাদের ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। ‘বাংলাদেশ এলপিজি সিলিন্ডার এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট গ্রুপ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে সুমাইয়া ইসলাম লিখেছেন, ‘দেশটা আসলে যাচ্ছে কোথায়? আজকে বসুন্ধরার ২টা এলপি গ্যাস নিয়ে আসলাম ৪ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘১টি ২ হাজার ৪৫০ টাকা করে। চিন্তা করেন। যেই গ্যাস ক্রয় করতাম ১২০০/১৪০০ টাকা, আজ সেই গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া। আমরা সাধারণ মানুষ কী করব?’
একই গ্রুপে বাবু মিয়া নামের একজন একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি ২ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস কেনার কথা উল্লেখ করেছেন। শেখ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি পেজ থেকেও ডিপোতে সিলিন্ডারের সরবরাহ না থাকার কথা জানিয়ে পোস্ট দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ‘৬৪ জেলা এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর অ্যাসোসিয়েশন’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে মো. রাসেল লিখেছেন, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া একটি বিক্রেতার মুঠোফোন নম্বরে ক্রেতা পরিচয়ে যোগাযোগ করা হলে রাকিব নামের ওই ব্যক্তি জানান, তাঁর কাছে সিলিন্ডার আছে, তবে পরিমাণ কম। দাম ২ হাজার টাকা। নরসিংদী থেকে নিতে হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে ‘এলপি গ্যাসের বাজার’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে সাতক্ষীরার এক খুচরা বিক্রেতার নম্বর পাওয়া যায়। মো. লাবিব নামের ওই বিক্রেতা জানান, তিনি ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ টাকা করে বিক্রি করছেন। তাঁর কাছে ওমেরা, আই গ্যাস ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার রয়েছে। তবে সরবরাহ বেশি নেই বলে জানান তিনি।
বিইআরসি ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশে এলপিজির আমদানি পর্যাপ্ত ছিল। তাই আমদানির ঘাটতির কারণে বাজারে সংকট হওয়ার কথা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় দেশে এলপিজির সরবরাহ ঘাটতি থাকার কথা নয়।
তবে বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি ও বিক্রির প্রকৃত চিত্র জানতে সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়ে ১২টি এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। শনিবার (৩ অক্টোবর) পাঠানো ওই চিঠিতে রোববারের মধ্যে তথ্য জমা দিতে বলা হয়। চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাওয়া আমদানির তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, রোববার তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা গতকাল শনিবারও অফিস করেছি। ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছি। তারা সেপ্টেম্বরে কী পরিমাণ এলপিজি বিক্রি করেছে জানতে চেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মিনিস্ট্রি কাজ করছে। জেলা পর্যায় পর্যন্ত তদারকি করা হচ্ছে। আজ নতুন দাম ঘোষণা করা হবে। এরপর আরও কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে।’
সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে শনিবার ঢাকাসহ দেশের ১৬ জেলায় বিশেষ তদারকি অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের ২৩টি দল একযোগে ডিলার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালায়। এ সময় বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, এলপিজির স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়া বন্ধ করতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও প্রদান, সিলিন্ডারের নিরাপত্তাবিধি মানা হচ্ছে কি না এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হয়।
এ ছাড়া কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিকভাবে সিলিন্ডার মজুত ও সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করতে ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়েও তাঁদের সতর্ক করা হয়।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, সিলিন্ডার কেনার আগে ওজন, সিল, মেয়াদ ও দৃশ্যমান ত্রুটি যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যতালিকা দেখে পণ্য কিনতে এবং কেনার সময় রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।
কোনো অনিয়ম হলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১-এ অভিযোগ জানানো যাবে। বাজারে শৃঙ্খলা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এলপিজি সরকার আমদানি করে না। এটা প্রাইভেট কোম্পানি আনে। এটাকে ঠিক রাখার জন্য আমরা কাজ করছি। দিন-রাত কাজ করছি। সুতরাং দেখা যাক কতদূর কী করা যায়।’
১২৬ বার পড়া হয়েছে