আজ বিশ্ব প্রবীন দিবস
ঠাঁই পেলেন না নিজের বাড়িতে, ৯ বছর ধরে শান্তি নিবাসে সাজ্জাদ
শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬ ১:১৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে স্ত্রীর নামে জমি কিনেছিলেন। সেই জমিতে নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন স্বপ্নের বাড়ি। ট্রাক চালিয়ে জীবনের ক্লান্ত সময়টুকু স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে সেই বাড়িতেই কাটানোর আশা ছিল ৭০ বছর বয়সী সাজ্জাদ হোসেনের। কিন্তু একদিন সামান্য সাংসারিক কথাকাটাকাটির পর স্ত্রীর একটি কথাই তাঁকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করে। এরপর আর ফেরা হয়নি নিজের গড়া সেই ঘরে। প্রায় নয় বছর ধরে ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকার সরকারি শান্তি নিবাসেই কাটছে তাঁর দিন।
ফরিদপুরের শান্তি নিবাসে বসে সাজ্জাদ হোসেন যখন নিজের জীবনের গল্প বলেন, তখন তাতে নেই তেমন কোনো অভিযোগ। বরং কণ্ঠে শোনা যায় একধরনের মেনে নেওয়ার শান্তি। যে বাড়িটিকে ঘিরে ছিল জীবনের শেষ বয়সের স্বপ্ন, সেই বাড়ি এখন তাঁর কাছে অনেক দূরের স্মৃতি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শান্তি নিবাসেই থাকতে চান তিনি।
সাজ্জাদ হোসেনের জন্ম ১৯৫৬ সালের দিকে সিলেটে। বাবার চাকরির সুবাদে পরে ফরিদপুরে চলে আসেন। জীবনের বড় একটি সময় ট্রাক চালিয়ে সংসার চালিয়েছেন। স্ত্রী হামেদা বেগম নার্গিসকে নিয়ে ফরিদপুর শহরতলির বদরপুর এলাকায় গড়ে তোলেন নিজেদের বাড়ি। তাঁদের সংসারে তিন ছেলে—তানজির হোসেন, তানভীর হোসেন ও তাজবীর হোসেন এবং চার মেয়ে—সুরাইয়া, সুলতানা, লাকি ও ইতি।
সন্তানদের সবাইকে বিয়ে দিয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন। চার মেয়ে বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে সংসার করছেন। ছেলেদের মধ্যে এক ছেলে একসময় বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়িতে থাকতেন।
কিন্তু প্রায় নয় বছর আগে একদিন সামান্য সাংসারিক বিষয় নিয়ে স্ত্রী নার্গিসের সঙ্গে তাঁর কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে স্ত্রী তাঁকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেন। সেই কথা গভীরভাবে মনে নেন সাজ্জাদ। অভিমানে নিজের উপার্জনের টাকায় গড়া বাড়ি ছেড়ে সেদিনই বেরিয়ে পড়েন।
এরপর কয়েক দিন কখনো এখানে, কখনো সেখানে থেকেছেন। খাবারের জন্যও অন্যের দিকে তাকাতে হয়েছে। পরে ট্রাকচালক সমিতির সহায়তায় তাঁর ঠাঁই হয় ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকার সরকারি শান্তি নিবাসে। সেই থেকে প্রায় নয় বছর ধরে এখানেই তাঁর ঠিকানা।
সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘এখানকার খাবারের মান অনেক ভালো। বাসার খাবারের চেয়েও ভালো খাবার পাই। এখানকার সবাই আন্তরিক। থাকতে কোনো সমস্যা হয় না।’
শান্তি নিবাসের বিছানা, পাখা, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথাও জানান তিনি। নিজের বাড়ির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এখানে তিনি অনেকটা ভালোভাবেই আছেন।
তবে সন্তানদের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর কণ্ঠে কিছুটা অভিমানের ছোঁয়া পাওয়া যায়। তিনি জানান, মেয়েরা মাঝেমধ্যে তাঁর খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তিন ছেলে তাঁর কোনো খোঁজখবর রাখেন না বলে আক্ষেপ করেন। ছেলেদের বিষয়ে আর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে স্ত্রী কিংবা সন্তানদের প্রতি বড় কোনো অভিযোগও নেই তাঁর। নিজের গড়া বাড়িতে ফেরার আকাঙ্ক্ষার কথাও বলেন না। বরং শান্তি নিবাসকেই এখন নিজের শেষ ঠিকানা হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
ফরিদপুরের টেপাখোলা এলাকায় সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত সরকারি শান্তি নিবাসে ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বর্তমানে সেখানে আছেন ১২ জন। তাঁদের মধ্যে চারজন পুরুষ ও আটজন নারী।
নিবাসটিতে ১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই। ফলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালিত সেইফ হোমের জনবল দিয়ে শান্তি নিবাসের বাসিন্দাদের খাবারসহ অন্যান্য কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সেইফ হোমের কর্মকর্তা তাহসিনা জামান বলেন, শান্তি নিবাসের ধারণক্ষমতা ৫০ জন হলেও বর্তমানে সেখানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১২ জন থাকছেন। তবে নিবাসে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকায় সেইফ হোমের জনবল দিয়েই প্রবীণদের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ করতে হচ্ছে।
সাজ্জাদ হোসেনের জীবনের গল্পে তাই ‘বাড়ি’ শব্দটির অর্থ যেন বদলে গেছে। যে বাড়ি একদিন নিজের হাতে গড়েছিলেন, সেটি এখন তাঁর স্মৃতির অংশ। আর যে শান্তি নিবাসে একসময় এসে উঠেছিলেন অনেকটা অনিচ্ছায়, নয় বছর পর সেটিই হয়ে উঠেছে তাঁর আপন ঠিকানা।
১২১ বার পড়া হয়েছে