সর্বশেষ

জাতীয়

আইফোনের লোভেই অপ্রতিমকে হত্যা: আসামিদের জবানবন্দি

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:২৬ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি তোলা ও টিকটক করার সূত্রে পরিচয়। এরপর ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি লোভ থেকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় সাত দিন আগেই। ছবি তোলার কথা বলে তাকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে প্রথমে তার আইফোন নেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার মৃত্যু হয়।

কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নেওয়া, তার আইফোন নেওয়া এবং প্রথম আঘাতের বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পরের ঘটনাপ্রবাহ ও কে কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে তাদের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনটি জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন তুহিন।

তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তাঁর বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক করার জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো।

জবানবন্দিতে তুহিন বলেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাঁর এবং অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ হয়েছিল। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে তাঁদের দুজনের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার বক্তব্য, তুহিন আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে মারার পরিকল্পনা করেন।

অপর কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার এক বন্ধু তাকে জানায়, তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

অর্থাৎ তিন জবানবন্দিতেই একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি। আইফোনকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। অপ্রতিম তাঁকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই তুহিন টিকটকে অপ্রতিমকে বার্তা পাঠান। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেখানে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

অপ্রতিম তাঁর বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল বলে তুহিনের বর্ণনায় এসেছে। কথা ছিল, তাঁরা ছবি তুলবেন। এই ছবি তোলার সম্পর্কই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে বলে তিন আসামির জবানবন্দি থেকে জানা যায়।

অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তার চেয়ে ৫ থেকে ১০ বছরের বড় যুবকদের সঙ্গে মেলামেশা ও সম্পর্ককে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় বলে তুহিন জানিয়েছেন। এরপর তাঁকে ‘বুদ্ধি দিয়ে’ সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তুহিন। জবানবন্দিতে তিনি জায়গাটিকে নির্জন এলাকা এবং তাঁর চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানিয়েছে, বেলা দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগমুহূর্তে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ে যায়। সেখানে যাওয়ার আগেই সে ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়।

তৃতীয় কিশোরের বর্ণনাও প্রায় একই। সে জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই সে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে যায়। সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।

চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয়েছিল—এ বিষয়েও তিন জবানবন্দির বর্ণনায় মিল রয়েছে।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জবানবন্দিতে বলেছে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে দেয়।

তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের বর্ণনা রয়েছে। ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সেটি আর অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

পুলিশও এর আগে জানিয়েছিল, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপর তাঁকে মারধর করা হয়।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে মিল রয়েছে। তাঁদের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন। প্রথমে তাঁকে একটি থাপ্পড় মারেন তুহিন। পরে পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল নিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। এরপর অন্য দুজনকে মারতে বলেন।

দোকানে কর্মরত কিশোরটির বক্তব্যেও এসেছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়া হওয়ার পর তুহিন পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। তৃতীয় কিশোরও বলেছে, তুহিনই প্রথম ওই হাতল দিয়ে অপ্রতিমকে আঘাত করেন।

তিন জবানবন্দিতে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েও মিল পাওয়া যায়। তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাঁদের লোভ হয়েছিল।

দ্বিতীয় কিশোর তার জবানবন্দিতে বলেছে, পরিকল্পনা ছিল তুহিন আইফোনটি বিক্রি করে তাকে টাকার ভাগ দেবেন। এ কারণেই তারা এ কাজ করে।

তৃতীয় কিশোরও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। তার ভাষ্য, তাকে বলা হয়েছিল আইফোনটি বিক্রি করে টাকার ভাগ দেওয়া হবে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর কে কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

তুহিন বলেছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায়। তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন। দ্বিতীয় জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়। তখন তুহিন সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয় কিশোরও বলেছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে যান।

তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিন আসামির বয়ানেই এমন তথ্য এসেছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে তাঁর বন্ধু মো. সিয়াম (১৯) সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে।

তুহিনের ভাষ্য, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাঁকে সব কথা খুলে বলেন। সিয়াম অপ্রতিম হত্যার পরিকল্পনার কথা আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের কোনো সম্পৃক্ততার কথা নেই।

পুলিশ পরে সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য ছিল, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন। পুলিশ সূত্র জানিয়েছিল, হত্যার দিন রাতেই তুহিন তাঁর সঙ্গে দেখা করে হত্যার বিস্তারিত জানিয়েছিলেন।

জবানবন্দিতে হত্যার পরদিনের আচরণের কথাও এসেছে।

তুহিন বলেছেন, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাঁকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়িতে অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি বলেছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার একজন সহকারীর সঙ্গে অপ্রতিমকে খুঁজেছে। পরে অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়ার খবর শুনে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

অন্য কিশোর জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সে এবং তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়।

এর মধ্যেই পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের পর তাঁর বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।

২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাঁদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে যাচাই করা হবে। হত্যাকাণ্ডে আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনটি জবানবন্দি পাশাপাশি রাখলে অপ্রতিমের সঙ্গে আসামিদের পরিচয়, আইফোনের প্রতি লোভ, আগে থেকে হত্যার পরিকল্পনা, নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, ফোন হাতে নেওয়া এবং এরপর হামলার মূল ঘটনাক্রমে মিল পাওয়া যায়। তবে হত্যাকাণ্ডে কার ভূমিকা কতটা ছিল, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।

এখন সেই বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষায় অপ্রতিমের পরিবার, সহপাঠী ও কুমিল্লার মানুষ। যে বিকেলে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম, সেই বিকেলের ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এখন স্বজনদের প্রধান প্রত্যাশা।

১১৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০