শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে বৈশ্বিক সংকট সমাধান সম্ভব নয়: গুতেরেস
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:০৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, বৈশ্বিক সংকট এখন আরও গভীর ও জটিল রূপ নিয়েছে। শুধু সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়ে এসব সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সংকট মোকাবিলায় পুনর্গঠিত ও সর্বজনীন জাতিসংঘের অধীনে নতুন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রয়োজন।
মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে এসব কথা বলেন আন্তোনিও গুতেরেস। প্রায় ১০ বছর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন শেষে দেওয়া ভাষণে তিনি যুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
৭৭ বছর বয়সী পর্তুগিজ এই কূটনীতিক বলেন, তাঁর দায়িত্বকালে বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এবং দীর্ঘায়িত হয়েছে। বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করা হয়েছে।
গুতেরেস বলেন, ভূরাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়েছে, বৈষম্য বেড়েছে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা কমেছে। জলবায়ু সংকট এখন আর ভবিষ্যতের কোনো সতর্কবার্তা নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি এর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের বিষয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গাজা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, মহাসচিব হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এমন পরিস্থিতি আগে দেখেননি।
তাঁর ভাষণে ইসরায়েলের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে গাজায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ত্রাণ সরবরাহের পথ উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করেন গুতেরেস। তাঁর ভাষায়, সেখানে সহিংসতা, উচ্ছেদ ও ইহুদি বসতি স্থাপনের কার্যক্রম শান্তির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং জাতিগত নিধনের আশঙ্কা তৈরি করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, রাশিয়ার আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের গুরুতর লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার কিছু অঞ্চলে বাড়িঘর, বিদ্যুৎ, পানি ও পরিবহন অবকাঠামোয় হামলার ঘটনাও ঘটছে, যা বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে।
গুতেরেস বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, পরাশক্তিগুলোর নিজেদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে শান্তি নিশ্চিত করা যায় না, অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায় না এবং প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়েও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে বিভাজন এবং আধিপত্যবাদী প্রবণতা নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তিত হলেও শাসনব্যবস্থা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না।
গুতেরেস বলেন, রাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষমতার একটি অংশ গুটিকয়েক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ধনকুবেরের হাতে চলে গেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, তথ্যপ্রবাহ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে মানুষ ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে এবং স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্ব কি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও কমে যাওয়া সহযোগিতার কারণে আরও বিভক্ত হবে, নাকি জাতিসংঘের নেতৃত্বে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার দিকে এগোবে।
গুতেরেস বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমতা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পরিচালিত হবে, নাকি আইনের বাইরে। দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে আন্তর্জাতিক সনদ রক্ষা এবং কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে অন্যায্য বলেও মন্তব্য করেন গুতেরেস। তহবিল সংকট ও নানা সমালোচনা সত্ত্বেও জাতিসংঘই এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে শক্তিশালী পক্ষগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জাতিসংঘে নারী-পুরুষের সমতা প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্ব, প্রধান কার্যালয় ও পেশাদার পদগুলোতে নারী ও পুরুষের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সমতা কোনো স্বপ্ন নয়; এটি একটি সিদ্ধান্ত। জাতিসংঘ পরিবর্তিত হতে পারলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পার্লামেন্ট, সরকার ও শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।
১১০ বার পড়া হয়েছে