সর্বশেষ

ফেবু লিখন

নির্জনতার মাঝেও এক অদ্ভুত মায়া

হাবীব চৌহান
হাবীব চৌহান

শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ৩:১৯ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
সেদিন শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটা আয়োজনে ব্যস্ত ছিলাম।
কথা বলছিলাম সবার সাথে—সব ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু কোথায় যেন নিজের ভেতরটা ফাঁকা লাগছিল।
এমন সময় হঠাৎ ফোন এলো, এক ঘনিষ্ঠ সঙ্গী (সিনিয়র) চলাফেরায় একেবারে বন্ধুর মতো, আর সম্পর্কের গভীরতায় অনেক বড়।

ফোনটার রিংটোন বন্ধ ছিল তখন। ফোনটা টেবিলে রেখে সামনে অতিথিদের লাইনে বসে ছিলাম। হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো ফোনে। তাঁর নামটা দেখলাম, কিন্তু ফোনটা রিসিভ করতে পারলাম না।
কেন ফোন দিলো—
তা নিয়ে ভাবার সময়ও ছিল না। শুধু মনে হলো, পরে কথা হবে…
সবকিছুর শেষে দুপুরের পরে বাড়ি ফিরলাম।
শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মনের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। রিপোর্ট করতে বসলাম। ঠিক তখনই আবারও ফোন—
সেই সিনিয়র ঘনিষ্ঠ জনের।
ফোনটা রিসিভ করলাম, আর ওপাশ থেকে পরিচিত সেই কণ্ঠ—
"কী গো, কিছু হয়েছে নাকি? সকালে ফোন ধরলে না তো? তাই আবার…"
উত্তর জানালাম, "না ভাই, কিছু হয়েছে না… একটা অনুষ্ঠানে ছিলাম।"
তিনি বললেন, "এখনো কি ব্যস্ত আছো?"
"না।"
"তাহলে চলো, একটু বাইরে যাই।"

আমরা দু'জনই প্রায়ই দূরের গ্রামের নির্জন মাঠে, ঘাটে ঘুরতে যাই। কখনো সে, কখনো আমি আগে ফোন দিয়ে বাইরে যাওয়ার কথা বলি।
সেই দিন একই কারণে তিনি আমাকে আগে ফোন দিয়েছিলেন…
আমি বললাম, ঠিক আছে, আসেন। তখন আমার রিপোর্ট তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে।
রিপোর্টটা দ্রুত পাঠিয়ে দিলাম। মনে হচ্ছিল, কাজটা শেষ করা জরুরি—কিন্তু কোথাও যেন আরও জরুরি কিছু আমাকে ডাকছে।

প্রস্তুত হয়ে গেটের দিকে যেতেই বাইরে হর্ণ বাজলো।
আমি গিয়ে চুপচাপ চেপে বসে পড়লাম। আর চলতে শুরু করলো নিঃশব্দের ও আরামদায়ক বাহন স্কুটি।
শহরের ভিড়, শব্দ, ধুলা, ধোঁয়া—সব ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যেতে লাগলো।
আমরা দু’জনই চুপ। কোনো কথা নেই, নীরবে ছুটে চলেছি, বিকালের বাতাস খুব ভালো লাগছিল।
কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি বললেন,
"কিসের আয়োজন ছিল?"
"শিক্ষার্থীদের ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করতে মতবিনিময় ও অঙ্গীকার করানো…।"
"ভালো তো!" বলেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন, "আজকাল চারদিকে যা শুরু হয়েছে, তাতে ভালো ছেলে-মেয়েরাও বিপথে চল যাচ্ছে।" বিড় বিড় করে বলেই যাচ্ছেন তিনি। আমি চুপ হয়ে গেলাম। কথাগুলো সত্যিই বলছিল। স্কুটিও এগিয়ে চলেছে নিঃশব্দে…

একসময় পাকা রাস্তা ছেড়ে আমরা ঢুকে পড়লাম গ্রাম্য পথে। চিকন মাটির বাউরি, দু’পাশে ধানের মাঠ, মাঝেমধ্যে পুকুরের পানি চিকচিক করছে।
দূরে পাখিরা উড়ে যাচ্ছে দল বেঁধে—যেন আমাদেরই কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে।
ওই সময় হঠাৎ নিজের ভিতরেই শৈশবের…

আমরা পৌঁছে গেলাম চারপাশে শুধু সবুজ, আর সবুজ।
বাতাস বইছে ধীরে, তবুও ধানের পাতা ও শীষগুলো দুলছে—যেন কেউ অদৃশ্য হাতে তাদের ছুঁয়ে দিচ্ছে।
আমি নেমে দাঁড়ালাম।
মনে হলো, বুকের ভিতর জমে থাকা সব ক্লান্তি একসাথে নিঃশ্বাস হয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।

এমন সময় সিনিয়র পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, "আসলে মাঝে মাঝে এখানে চলে আসা দরকার আমাদের। শহরটাকে এখন বিষাক্ত মনে হয়, পরিবেশ, প্রতিবেশ—সবকিছু খুব জটিল হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে…"
আমি তাকালাম তার দিকে।

সিনিয়র আবার বললেন, "এই জায়গাটা আমাকে মনে করিয়ে দেয়—জীবন আসলে খুব সহজ ছিল, আমরা নিজেরাই তাকে কঠিন বানিয়ে ফেলেছি।"

আমি কিছু বললাম না। শুধু চারদিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। সবুজ ধানের মাঠ জুড়ে বাতাসের মৃদু দোলা, দূরে কারো গরু চরানোর সুর, পাখিদের ডানায় ভেসে বেড়ানো স্বাধীনতা—সবকিছু মিলে যেন এক অনন্ত কবিতা।

এখানে কৃত্রিমতার কোনো স্থান নেই। এখানে কেউ অভিনয় করে না। এখানে জীবন নিজেই নিজের মতো করে বেঁচে থাকে।
আমরা হাঁটতে লাগলাম। আর নির্জনতার মাঝেও এক অদ্ভুত মায়া অনুভব করলাম—যেন এই নীরবতাও কথা বলে, এই বাতাসও গল্প শোনায়।

হঠাৎ সিনিয়র বললেন, "অনেক দৌড়িয়েছি… কিন্তু আর নয়। এখন নিজের জন্যও ভাবতে হবে, তাই চলতে হবে প্রকৃতির সাথে।"
আমি মাটির দিকে তাকিয়ে বললাম, "ঠিকই বলেছেন, এমন মুহূর্ত আমরা শহরে কখনোই পাবো না।"
তিনি হালকা হেসে বললেন, "তাই তো এখানে চলে এলাম…"

বাতাসটা একটু জোরে বইতে শুরু করলো তখন। ধানের মাঠ ঢেউয়ের মতো দুলে উঠলো। মনে হলো, প্রকৃতি নিজেই যেন এক কবি হয়ে সবুজের ক্যানভাসে লিখে যাচ্ছে—
"থামো… একটু থামো… নিজের ভেতরে ফিরে যাও…"
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
অনেকদিন পর নিজের ভেতরে একটা শান্তি অনুভব করলাম।
ধীরে ধীরে বললাম, "ভাই… মানুষ যদি একবার এখানে আসে, তাহলে কি আর আগের মতো থাকতে পারে?"
তিনি মৃদু হেসে বললেন, "না… কারণ এখানে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়। আর একবার নিজেকে খুঁজে পেলে আগের মতো থাকা যায় না।"

সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আমাদের ছায়া লম্বা হয়ে যাচ্ছে মাঠের ওপর। সবকিছুর স্মৃতি ধরে রাখতে চারদিক ঘুরে ফিরে ছবি তুলছিলাম আমি।
আর মনে মনে ভাবলাম—
এই অনুভূতিটা শুধু নিজের মধ্যে আটকে রাখলে অন্যায় হবে। শহরের সেই মানুষগুলো, যারা প্রতিদিন নিজের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে—তাদেরও তো এই গল্প জানা উচিত।
হয়তো একদিন মানুষ এখানে আসবে, হয়তো তারাও বসবে এই ধানের মাঠের পাশে, তাদেরও হয়তো একদিন বুঝবে—
জীবন আসলে খুব বেশি কিছু চায় না।

সেদিন ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটা জায়গা থেকে ফিরছি না—
এই গ্রাম শুধু একটি স্থান নয়, এ যেন হৃদয়ের এক অন্যরকম অনুভূতি…
যেখানে আমরা শুধু ঘুরতেই আসি না—নিজেকে খুঁজে পেতে, আর নিজের ভেতরের নীরব কবিতাটাকে শুনতে, বারবার ছুটে আসি…

লেখক: সাংবাদিক।

১৭৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন