ইসলামে নারী নেতৃত্ব: কোরআনের আয়াত ও জামায়াত আমিরের বক্তব্য
বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৩:৪০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের আল জাজিরায় দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে নারীদের দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়ার ঘোষণা ইসলামে নারী নেতৃত্ব ও পবিত্র কোরআনের বয়ানকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির পদে কোনো নারী “কখনোই” আসতে পারবেন না; তাঁর দাবি, আল্লাহ পুরুষ ও নারীর দায়িত্ব আলাদা করে দিয়েছেন এবং সৃষ্টিগতভাবে নারীর জৈবিক ভূমিকা—সন্তান ধারণ ও দুধ পান করানো—তাদের জন্য এমন নেতৃত্বের পথ বন্ধ করে দেয়। এই যুক্তি সামনে এনে তিনি দলীয় নীতিকে ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে একাকার করে উপস্থাপন করেছেন।
কিন্তু পবিত্র কোরআনের পাঠে নারী নেতৃত্বের প্রশ্নটি এত সরল ও একরৈখিক নয়। সুরা আন–নামল–এর ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সাবা বা শেবার এক নারী শাসকের কথা উল্লেখ করেন—“আমি তাদের উপর এক নারীকে পেয়েছি; সে তাদের শাসন করছে এবং তার রয়েছে এক মহা সিংহাসন”—এখানে নারীকে জনগণের উপর শাসনকারী, সিংহাসন–অধিকারী একজন পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রনেত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, কোনো নিন্দা ছাড়া। পরের আয়াতগুলোতে (আন–নামল ২৭:৩২–৩৫) দেখা যায়, এই নারী শাসক তার উপদেষ্টাদের ডেকে বলেন: “হে প্রধানগণ, আমার ব্যাপারে তোমরা মতামত দাও; তোমরা উপস্থিত না থাকলে আমি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না।” অর্থাৎ কোরআন তাকে শূরা (পরামর্শ)–নির্ভর, কূটনৈতিক ও প্রজ্ঞাবান নেতা হিসেবে দেখাচ্ছে—সে নারী বলেই তার নেতৃত্বকে সরাসরি বাতিল করে দিচ্ছে না। অবশেষে, সোলায়মান (আ.)–এর সত্য প্রমাণ স্পষ্ট হলে তিনি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেন—“আমি সোলায়মানের সঙ্গে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম, যিনি বিশ্বজাহানের প্রতিপালক”—এখানেও কোরআন তার পূর্বের নেতৃত্বকে ‘লিঙ্গের কারণে অবৈধ’ বলে চিহ্নিত করেনি; বরং সত্যের প্রতি নতি স্বীকারকে মূল বলে ধরেছে।
ডা. শফিকুর রহমান যে “আল্লাহ দায়িত্ব আলাদা করেছেন” যুক্তির কথা বলেছেন, তার প্রেক্ষাপটে সাধারণত সুরা আন–নিসা–এর ৩৪ নম্বর আয়াতটি সামনে আনা হয়: “পুরুষরা নারীদের ওপর কাওয়াম (দায়িত্বশীল/অভিভাবক), কারণ আল্লাহ একটি অংশকে অপরটির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।” ক্লাসিক তাফসিরে এই আয়াতকে পরিবার–কাঠামোর প্রেক্ষিতে—স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্ক, ভরণ–পোষণ ও পারিবারিক শৃঙ্খলার দায়িত্ব বণ্টনের আলোচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখান থেকে কিছু ফকিহ পুরুষের জন্য বড় বড় নেতৃত্বের অগ্রাধিকার টানলেও, আয়াতটি নিজে রাষ্ট্রীয়, সাংগঠনিক বা দলীয় নেতৃত্বে নারীদের জন্য স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দেয় না; বরং “কাওয়ামত”কে পরিবারের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের দিকেই বেশি কেন্দ্র করে। ফলে ৪:৩৪ আয়াতকে সরাসরি দলীয় আমির পদে নারীর স্থায়ী নিষেধের “কোরআনিক প্রমাণ” হিসেবে তুলে ধরা একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার ফল, যা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে মতভেদ আছে।
নেতৃত্বের মানদণ্ড নিয়ে কোরআনের আরও কিছু মৌলিক দিকনির্দেশনাও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। সুরা আল–হুজুরাত–এর ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকি”—এখানে মানবের সম্মান–মর্যাদার মূল মাপকাঠি হিসেবে তাকওয়াকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, লিঙ্গ বা বংশকে নয়। অন্য আয়াতগুলোতে ন্যায়বিচার, আমানতদারি, হক আদায় ও পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ চালানো—এসবকেই নেতৃত্ব ও শাসনের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে; কোথাও বলা হয়নি, নেতৃত্বের বৈধতার শর্ত হলো শুধু “পুরুষ হওয়া”। অর্থাৎ কোরআন নেতৃত্বের আলোচনায় যে নীতিমালা দেয়, তা যোগ্যতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে, লিঙ্গ–ভিত্তিক চিরস্থায়ী নিষেধের ভাষায় নয়।
এই প্রেক্ষাপটে আল জাজিরা–সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমিরের অবস্থানকে কোরআনের আলোকে বিচার করলে, একটি স্পষ্ট ব্যবধান চোখে পড়ে। কোরআন যেখানে এক নারী রানিকে—তার সব সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটসহ—প্রজ্ঞাবান ও পরামর্শ–নির্ভর রাষ্ট্রনেত্রী হিসেবে উদাহরণ আকারে তুলে ধরে, সেখানে ডা. শফিকুর রহমান নারীর জৈবিক ভূমিকা ও মাতৃত্বকে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের স্থায়ী অযোগ্যতার যুক্তি বানিয়ে ফেলেন। কোরআন যেখানে তাকওয়া ও ন্যায়কে নেতৃত্বের মূল শর্ত ঘোষণা করে, সেখানে জামায়াত আমির লিঙ্গ ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যকে প্রথম শর্তে পরিণত করেন, এবং বাস্তবে তা প্রমাণিত হয়—দলে কোনো নারী আমির হওয়ার সম্ভাবনা নেই, এমনকি বর্তমান জাতীয় নির্বাচনেও একজন নারী প্রার্থী পর্যন্ত মনোনয়ন পাননি। কোরআনের আয়াতগুলো নারীর নেতৃত্বকে সরাসরি হারাম বলে না, বরং এক নারী রাষ্ট্রনেত্রীর ইতিবাচক বয়ান ও ন্যায়–তাকওয়া–শূরাভিত্তিক নেতৃত্বের আদর্শ সামনে রাখে; সেই তুলনায় জামায়াত আমিরের বক্তব্যকে অনেকেই কোরআনের পূর্ণাঙ্গ পাঠ নয়, বরং সীমিত ফিকহি ব্যাখ্যা ও দলীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার মিশ্রণ হিসেবে দেখছেন, যা ইসলামের নামে নারীর রাজনৈতিক ও সংগঠনিক সম্ভাবনাকে সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক
২৫৯ বার পড়া হয়েছে