বিতর্কিত তিন নির্বাচন ছিল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ফল: তদন্ত কমিশন
সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ৫:০৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকেই ক্ষমতায় থাকার একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ ছিল—এমন মন্তব্য করেছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিশন। পরে যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি ভোট’—এই তিনটি নির্বাচনই ছিল প্রতারণাপূর্ণ ও সুপরিকল্পিত। এসব অনিয়ম বাস্তবায়নে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকলেও সময় স্বল্পতার কারণে নির্দিষ্টভাবে তাদের নাম ও ভূমিকা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয় এবং বাকি আসনগুলোতেও প্রকৃত প্রতিযোগিতা ছিল না। আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর কৌশল নেওয়া হয়। কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারা হয়। কোথাও কোথাও ভোট পড়ার হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দল অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি প্রার্থী’ দাঁড় করিয়ে নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
কমিশনের মতে, এই তিন নির্বাচনের জন্য বিশেষ একটি ‘নির্বাচন সেল’ গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই নির্বাচন পরিচালনার প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। এতে নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যত নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে এসব বিতর্কিত নির্বাচনের ভিত্তি তৈরি হয়। এর ফলে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং জনগণের ভোটাধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করার কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—বিরোধী নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা, গণগ্রেপ্তার ও গুম, জাল ভোট, ব্যালট বাক্স আগে থেকেই ভর্তি করা, সংসদীয় সীমানা পুনর্নির্ধারণে অনিয়ম, আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন নিয়োগ এবং গোয়েন্দা সংস্থার অপব্যবহার।
সংস্কারের সুপারিশ হিসেবে কমিশন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী আইন প্রণয়ন, স্বাধীন ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠন, প্রশাসন ক্যাডার থেকে ইসিতে প্রেষণ বন্ধ, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলেছে।
সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সভাপতি সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন বলেন, “২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল প্রতারণার নির্বাচন। এর মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়েছিল ২০০৮ সালের পর থেকেই। এসব নির্বাচন কার্যত বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছে।”
১১০ বার পড়া হয়েছে