দেশ ছাড়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান থেকে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ ভাঙন
বৃহস্পতিবার , ১ জানুয়ারি, ২০২৬ ৬:৫২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বারবার সংকটের মুখে পড়েছেন, তবে দেশ ছাড়ার প্রশ্নে কখনো আপস করেননি- এমনটাই উঠে এসেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনায়।
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে খালেদা জিয়াকে সপরিবারে বিদেশে পাঠানোর সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সে সময় তাঁকে দেশ ছাড়তে প্রবল চাপ দেওয়া হয়। তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, বিদেশে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। তাঁর বক্তব্য-'বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। মরলে এ দেশের মাটিতেই মরব।'
সাংবাদিক মহিউদ্দিন মোহনের লেখা ‘ফিরে দেখা ওয়ান-ইলেভেন’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়, খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠাতে রাজি করানোর জন্য তাঁর দুই ছেলের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তবু সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই অবস্থানের কারণেই শেষ পর্যন্ত জরুরি সরকার নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য হয় এবং ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ কার্যত ভেঙে পড়ে।
ওই সময় খালেদা জিয়া ও তাঁর দুই সন্তান কারাগারে ছিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস জানান, একপর্যায়ে ১৩টি শর্তে তাঁকে মুক্ত করে প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে শর্তগুলো দেশের স্বার্থবিরোধী মনে করায় তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
ওয়ান-ইলেভেনের পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়া ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক ক্ষতির মুখে পড়েন। বড় ছেলে তারেক রহমানকে দীর্ঘ ১৭ বছর বিদেশে থাকতে হয়। নিজেও কখনো কারাগারে, কখনো গৃহবন্দিত্বে, আবার কখনো পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালে সময় কাটান।
২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির দিন গুলশানে নিজ বাসভবন থেকে বের হতে বাধা দেওয়া হলে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দেন। জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে দেওয়া ওই বক্তব্যে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সিকিমের সাবেক নেতা লেন্দুপ দর্জির সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, দালালি করে ও দেশ বিক্রি করে কেউ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
শেষ জীবনেও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশ ছাড়েননি। চিকিৎসক ও পরিবারের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি বিদেশে যেতে রাজি হননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। একাধিক মেডিকেল বোর্ড গঠন হলেও বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
সবশেষে দেশের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁর জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দেশমাতৃকার প্রতি অটল আনুগত্য এবং ক্ষমতার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান-যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
১১৬ বার পড়া হয়েছে