গুলশানে মৃত ব্যক্তির লাইসেন্সে ভুয়া মানি এক্সচেঞ্জ, শত কোটি টাকার মালিক লেলিন মুন্সী!

শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫ ১১:১১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্স ছাড়াই মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসা চালাচ্ছেন লেলিন মুন্সী নামের এক ব্যক্তি।
যশোর জেলার এক মৃত ব্যক্তির লাইসেন্স অবৈধভাবে ব্যবহার করে প্রায় ১৫ বছর ধরে এই ব্যবসা চালিয়ে আসছেন তিনি। রহমান মানি এক্সচেঞ্জের নামে ব্যবসা করেই লেলিন মুন্সী এখন শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গুলশানের জব্বার টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় প্রায় পাঁচ বছর ধরে মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসা করছেন লেলিন মুন্সী। এর আগে গুলশানেরই অন্য এক জায়গায় একইভাবে ব্যবসা করতেন। অথচ আইন অনুযায়ী অন্য জেলার লাইসেন্স ব্যবহার করে রাজধানীতে ব্যবসা করার কোনো অনুমতি নেই। তিনি যে মৃত ব্যক্তির লাইসেন্স ব্যবহার করছেন, তার ওয়ারিশদের কাছ থেকেও কোনো লিখিত অনুমতি নেননি।
গোপালগঞ্জের বাসিন্দা লেলিন মুন্সী রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি ও পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সহযোগিতা নিয়ে বহু বছর ধরে অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। মানি এক্সচেঞ্জের আড়ালে হুন্ডিই তার মূল ব্যবসা বলে অভিযোগ রয়েছে।
শূন্য থেকে শুরু করে আজ রাজধানীর আফতাব নগর, বসুন্ধরা ও বারিধারায় একাধিক ফ্ল্যাট ও জমির মালিক তিনি। চলাফেরা করেন কালো রঙের একটি সিআর-ভি গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো-ঘ, ১৭-৯০০১)। টাকার জোরে গুলশানের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকেও তিনি নিজের পক্ষে ম্যানেজ করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) জব্বার টাওয়ারে গিয়ে দেখা যায়, রহমান মানি এক্সচেঞ্জের সাইনবোর্ড খুলে ফেলা হয়েছে এবং দোকানটি বন্ধ। স্থানীয়রা জানান, লেলিন মুন্সী ও তার দুইজন নিকট আত্মীয় নিয়মিত এই দোকানে বসতেন। পাশের এক দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাংবাদিকরা আসার খবর পেয়ে সাইনবোর্ড নামিয়ে দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন লেলিন। তিনি আরও জানান, বহু বছর ধরে হুন্ডি ব্যবসা করছেন লেলিন মুন্সী। তার এখন প্রচুর পরিচিত গ্রাহক রয়েছে। ফোনেই লেনদেন হয়। এই ব্যবসা করে লেলিন শত কোটিরও বেশি টাকার মালিক হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ ও হুন্ডি ব্যবসা সম্পর্কে চুন্নু মুন্সীর ছেলে লেলিন মুন্সীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন। এবং রহমান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক বলেও দাবি করেন। তবে তিনি কিভাবে এই মানি এক্সচেঞ্জের মালিক? জানতে চাওয়ার পর তিনি জানাবেন বলে ফোন কেটে দেন। এরপর তাকে কয়েক দফা চেষ্টার পরও ফোনে পাওয়া যায়নি।
অন্য জেলার লাইসেন্স ব্যবহার করে মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের এক কর্মকর্তা বলেন, “অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে বা অনুমতি ছাড়া অন্য জেলায় মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসা করা অবৈধ এবং ফৌজদারি অপরাধ। এর জন্য অর্থদণ্ড, লাইসেন্স বাতিল, এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির পাশাপাশি ফৌজদারি আইন অনুযায়ী কারাদণ্ড বা অন্যান্য শাস্তি হতে পারে। এই ধরনের কার্যকলাপ অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।”
তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১৯ (FERA) অনুযায়ী কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার (ব্যাংক) বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানিচেঞ্জাররাই বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করতে পারে। অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করা এই আইনের পরিপন্থী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশনস বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, “বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম তদন্ত ও তদারকির ক্ষমতা রাখে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আর্থিক দণ্ড, লাইসেন্স বাতিল এবং কারাদণ্ডসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ভোক্তাদের সতর্ক করে বলেন, কোনো মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আছে কিনা এবং তারা নির্দিষ্ট জেলায় ব্যবসার অনুমতি প্রাপ্ত কিনা, তা যাচাই করে নেওয়া জরুরি। অন্যথায় গ্রাহকরা প্রতারণার শিকার হওয়ার পাশাপাশি হুন্ডির মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইডির তথ্যমতে, সারা দেশে অন্তত এক হাজার অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ডলার কেনাবেচার আড়ালে অর্থ পাচারের সঙ্গেও জড়িত। বৈধ-অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বাইরেও ভ্রাম্যমাণ কিছু ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা ফোনে ফোনে যোগাযোগ করে হোম ডেলিভারিতে বেচাকেনা করছেন দেশি-বিদেশি মুদ্রা। তবে সিআইডি অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জগুলো বন্ধ করতে এবং হুন্ডি ব্যবসার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কাজ করছে। সিআইডি ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে এসব মানি এক্সচেঞ্জের অফিসে অভিযান অব্যাহত রয়েছেে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসা খুলে ফুলেফেঁপে বড় হচ্ছে দেশের প্রায় হাজারখানেক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) থেকে এমন তালিকা পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে মাঠে নামার পর সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ এসব মানি এক্সচেঞ্জের পেছনে রয়েছেন অনেক রাঘববোয়াল। যাদের রয়েছে রাজনীতিক, সামাজিক ও অর্থনীতিক পরিচয়ও। ধীরে ধীরে তাদের পর্যন্তও পৌঁছাতে চায় সংস্থাটি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের এক কর্মকর্তা বললেন, অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ ও হুন্ডি ব্যবসা একটি অর্থপাচারমূলক ও দণ্ডনীয় অপরাধ, এবং এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনের জন্য কাজ করে। দুদক সরাসরি এই ব্যবসাগুলো তদন্ত ও প্রতিরোধ করে না, তবে অর্থপাচার প্রতিরোধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই আইনে অবৈধ লেনদেনের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড, জরিমানা, এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। এছাড়া এই আইনে জড়িত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানা হতে পারে।
এদিকে, যশোরের এক মৃত ব্যক্তির লাইসেন্স (রহমান মানি এক্সচেঞ্জ) ব্যবহার করে গুলশানে বহু বছর ধরে অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ ও হুন্ডি ব্যবসা চালিয়ে আসছেন লেলিন মুন্সী। বর্তমানে তিনি শত কোটি টাকার মালিক হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন অনুযায়ী যে কোনো সময় তিনি কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন বলেও জানান বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা।
৩৪৫ বার পড়া হয়েছে