মুক্তির চেতনার নামে রাজনৈতিক প্রতিশোধ: গণঅভ্যুত্থান,মব-হিংসা ও জাতীয় শঙ্কা

শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫ ৬:০১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশ আবারো এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সূচনায় দাঁড়িয়ে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব, গণঅভ্যুত্থান, এবং ক্ষমতার পালাবদল–প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশে নতুন এবং ভয়ঙ্কর সংকট তৈরি হয়েছে।
২০২৪-২৫ সালের ঘটনাবলী, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ আর অস্থিরতা বিরাজমান।
১৯৭১ বনাম ২০২৪
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার আজ প্রশ্নবিদ্ধ । সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো মুক্তিযুদ্ধকে তাদের নিজস্ব স্বার্থে ব্যবহার করেছে, চেতনার নাম বিক্রি হয়েছে, এবং বাস্তব মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে বারবার অপমানিত হতে হয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর “জুলাই বিপ্লব” ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দেশকে অস্থিরতার মধ্যে ফেলছে ।
রাজনৈতিক বিভাজন ও শাসনব্যবস্থার সংকট
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসনকাল শেষের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে বাংলাদেশ প্রবল অস্থিরতার জালে জড়িয়ে পড়ে। এককেন্দ্রিক ক্ষমতা, প্রশাসনের দুর্বলতা ও বিরোধী দলগুলোর দমন—সবকিছু মিলিয়ে জনগণের বিপর্যয় বাড়িয়েছিল ।
বিএনপি, জামায়াত, ও বিভিন্ন ফ্রন্ট, আগেও ১৯৯৬–২০১৮ সালে নির্বাচন বর্জন, সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে বিতর্কিত নির্বাচন, এবং ‘কেয়ারটেকার সরকার’ ইস্যুকে সামনে নিয়ে আন্দোলন করে এসেছে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং পরে, অন্তর্বর্তী সরকারের পদত্যাগ দাবি, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, এবং নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে তীব্র সংঘাত শুরু হয় ।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি: চেতনা ৭১ ও জুলাই যোদ্ধা
২০২৫ সালের ২৮ আগস্টে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে “চেতনা ৭১”-এর “মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান” শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ নেতা লতিফ সিদ্দিকী, ও কয়েকজন বরেণ্য ব্যক্তিকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামে পরিচিত গ্রুপের সদস্যরা অপমান ও হেনস্তা করে ১৬ জনকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ প্রথমে থানায় নেয় পরে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। ডিবি সন্ত্রাস বিরোধী আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এমন ঘটনায় মব-ভাইোলেন্স, ইতিহাস-কাঠামোর প্রতি অবজ্ঞা ও রাজনৈতিক চেতনাকে কলঙ্কিত করছে। যেখানে আলোচনায় অংশ নেয়াদের মতামত শুনে যুক্তিতর্ক না করেই তারা হুমকিস্বরূপ আচরণ করে ।
এ সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকৃতির অভিযোগ সামনে আসে—যারা একসময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাই আজ মবের হাতে, অফিসার বা দলীয় ট্যাগযুক্ত ব্যক্তি, এমনকি নিরপরাধ মুক্তিযোদ্ধা হয়রানির শিকার হচ্ছে।
মব হিংসা, লিন্চিং ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৪-২৫ সালে দেশজুড়ে মব-লিন্চিং, হত্যা, গ্রেফতার, অরাজকতার ভয়াবহ উত্থান ঘটেছে । Awami League-এর সাথে সংশ্লিষ্ট, এমনকি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রিয় নেতারাও মবের শিকার হয়েছেন। ক্যানাডা-বেসড GCDG রিপোর্ট বলছে, আগস্ট ২০২৪-জুলাই ২০২৫ সময়ে ৬৩৭ জন, তারমধ্যে ৪১ জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ, মবের হাতে নিহত হয়েছেন; যা আগে ছিল মাত্র ৫১ (২০২৩ সালে) । মানবাধিকার সংস্থা ASK জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ১২৮ জন এবং Manabadhikar Songskriti Foundation ১৪৬ জন লিন্চিংয়ের শিকার হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ঘটেছে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ।
রাজনৈতিক বিভাজন, চেতনা বিকৃতি ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা, ও জাতীয় নেতাদের মর্যাদা বারবার আক্রান্ত হচ্ছে । কোনো রাজনৈতিক মতবিরোধেই মতপ্রকাশ বা গণতান্ত্রিক আলোচনার সুযোগ নেই—এর বদলে ‘৬৯/৭১’ এর নামে অরাজকতা, আতঙ্ক ও দমনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে । পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এখানে শুধু এক ফ্যাসিবাদ বিদায় হয়নি, বরং বহু নতুন ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি হয়েছে ।
২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক ও কোটা বিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক সময়ে চাকরি, কোটা আন্দোলন, ছাত্রদের নেতৃত্বে বড় বড় গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, যেখানে ছাত্ররা সরাসরি রাষ্ট্রের দমনপীড়নের মুখোমুখি হয় ।
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ—১৯৭১-২০২৪—যে চেতনা নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল, তা বর্তমানে রাজনৈতিক লেবেলিং, বিভাজন, ও এখনকার ফ্যাসিবাদী বা আধা-ফ্যাসিবাদী আচরণে ম্লান হয়ে গেছে । অনেক মুক্তিযোদ্ধা, যাঁদের সাথীরা একসময় দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদেরকে এখন দলীয় আক্রমণ, সামাজিক অপমান, গ্রেফতার ও হেনস্তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সরকার ও প্রশাসন: সম্পূর্ণ নিস্ক্রিয়তা
সরকার অকার্যকর, প্রশাসন চরম নিস্ক্রিয়—এমন মন্তব্য এসেছে প্রধান প্রধান মানবাধিকার সংস্থা ও সাংবাদিকদের কাছ থেকে । রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ আজ হামলা, হুমকি, মব-ভাইোলেন্স ও হয়রানির শিকার। প্রকারন্তে সরকার পরোক্ষভাবে মব ভায়ালেন্সের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আওয়ামী লীগের কায়দায় মবের শিকার যারা তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে।
বর্তমান প্রশাসন দুর্নীতি, অদক্ষতা, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জর্জরিত—মানুষ স্বাধীন ভোটাধিকার, নিরাপত্তা, ও সামাজিক ন্যায়বিচার হারিয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ, বিদেশি বাজি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করেছে।
অভাগা বাংলাদেশের অন্তরে রক্তক্ষরণ
বাংলাদেশ আজ অন্ধকারে। ১৯৭১-এর রক্ত দিয়ে পাওয়া স্বাধীনতা আজ বারবার লুণ্ঠিত হচ্ছে; ইতিহাস, সংবিধান, মুক্তিযোদ্ধা—সব আজ ক্ষমতা ও মতাদর্শের খেলনারূপে ব্যবহৃত । কোনো প্রশ্ন তুললেই “আওয়ামী লীগ” ট্যাগ, কোনো মতপ্রকাশে “গণঅভ্যুত্থান” নামের উন্মাদনা—সংঘাত এখন অনিবার্য । অতিরিক্ত কিছু বাংলার মানুষ আগেও যেমন মেনে নেয়নি, এবারও নেবে না; দেশের বিভাজন, অপমান, মব-শাসন এভাবে চললে নব্য ফ্যাসিবাদী চক্র টিকে থাকবে, ইতিহাস আবার রক্তাক্ত হবে ।এবারের সংকটও পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়াতে পারে—এটাই বাংলাদেশের প্রতি ইতিহাসের সতর্কবার্তা।
রেফারেন্সসমূহ
• বাংলাদেশ সংবিধানিক সংকট, ২০২৪ (Wikipedia)
• বাংলাদেশ ২০২৪: রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা (VIF India)
• বাংলাদেশে পোস্ট-রেসিগনেশন ভাইোলেন্স (Wikipedia)
• লতিফ সিদ্দিকী ও রিপোর্টার্স ইউনিটি ঘটনার বিবরণ
• ইতিহাস বিকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা (The Diplomat)
• জুলাই বিপ্লব, সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি (Wikipedia)
• মব-লিন্চিং, মানবাধিকারের রিপোর্ট (New Indian Express)
• সরকার বদল ও ছাত্র আন্দোলন (CNN)
• বিক্ষোভ, গণঅভ্যুত্থান, ছাত্র আন্দোলন (BBC)
• বাংলাদেশে মব-লিন্চিং, নাগরিক অধিকার (Awaz The Voice)
• ছাত্র আন্দোলন ও সরকারি চাকরি কোটা (Asia Pacific Foundation)
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট
১৭৭ বার পড়া হয়েছে