সর্বশেষ

মতামত

উৎসব এলেই সড়কগুলো একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬ ৫:৪৩ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
উৎসবের আনন্দ আর কতকাল কান্নায় রূপ নেবে? উৎসব এলেই দেশের সড়কগুলো যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। আনন্দের পরিধি একটুও বদলায় না, শুধু বদলে যায় চিরতরে হারিয়ে যাওয়া কিছু নতুন, তাজা এবং স্বপ্নময় প্রাণ। এই নির্মম মৃত্যুর মিছিলে আসলে দায়ী কে? সড়ক ব্যবস্থাপনা, সড়ক পরিবহন মন্ত্রী, বিআরটিএ (BRTA), নাকি বাস-ট্রাক মালিক কর্তৃপক্ষ?

বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ‘উৎসবে ঘরে ফেরা’ শব্দগুচ্ছটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নাড়ির টানে, প্রিয়জনের হাসিমুখ দেখার আকুলতায় প্রতি বছর কোটি মানুষ চেনা উঠোনে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের এই বাংলায় উৎসবের আনন্দ খুব দ্রুতই রূপ নেয় শোকের কৃষ্ণগহ্বরে। পিচঢালা কালো রাস্তাগুলো যেন রক্তপিপাসু এক দানব, যা প্রতি উৎসবে নতুন, তাজা আর স্বপ্নময় প্রাণের আহুতি চায়। উৎসবের চিরচেনা রঙ একটুও বদলায় না, শুধু বদলে যায় নিথর হয়ে যাওয়া কিছু লাশের পরিচয়। প্রশ্ন হলো, এই অন্তহীন মৃত্যুর মিছিলের শেষ কোথায়? আর এর দায় আসলে কার?

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আমাদের এক শিউরে ওঠার মতো বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। কেবল বিগত ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনের ঈদযাত্রাতেই দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮.২৬ শতাংশ বেশি। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের চেয়েও আমাদের সড়কে হতাহতের এই হার অনেক ক্ষেত্রে বেশি বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। একে কি কেবলই ‘দুর্ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব? নাকি এটি মূলত একটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলাজনিত কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড?

এই মৃত্যুর মহোৎসবে সবার আগে আঙুল ওঠে দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর দিকে। বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হলেও, বিপজ্জনক বাঁক কিংবা ‘ব্ল্যাক স্পট’গুলোর ত্রুটিপূর্ণ নকশা এখনো রয়ে গেছে। একই রাস্তায় যখন দ্রুতগতির দূরপাল্লার বাসের পাশে ধীরগতির থ্রি-হুইলার চলে, তখন দুর্ঘটনা অবধারিত হয়ে ওঠে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, উৎসবের মৌসুমে সড়ক তদারকির সেই কড়াকড়ি যেন কর্পূরের মতো উড়ে যায়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন সময়ের দাবি। নিয়ম অনুযায়ী অদক্ষ চালক বা ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উৎসবের দিনগুলোতে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িগুলো একটু নতুন রঙ মেখে মহাসড়কে যমদূত হয়ে নামে। টাকার বিনিময়ে ভুয়া বা অদক্ষ চালকদের হাতে লাইসেন্স তুলে দেওয়ার যে ‘ওপেন সিক্রেট’ বাণিজ্য চালু আছে, তার দায় বিআরটিএ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। প্রতি বছর ঈদের আগে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘নির্বিঘ্ন যাত্রা’র যে আশ্বাসের ফুলঝুরি শোনানো হয়, তা ঈদের পর লাশের সংখ্যার নিচে চাপা পড়ে যায়। এত মৃত্যুর পরও কোনো সংস্থাকে কখনো নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে দেখা যায় না।

এই চক্রের সবচেয়ে লোভী পক্ষটি হলো বাস ও ট্রাক মালিক কর্তৃপক্ষ। উৎসবের এই কয়েকটা দিন তাদের কাছে সেবার মাধ্যম নয়, বরং কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসার মৌসুম। বেশি ট্রিপ মেরে অতিরিক্ত মুনাফা তোলার জন্য তারা চালকদের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে একজন চালককে একটানা ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমহীন চোখে স্টিয়ারিং ধরে রাখতে হয়। তীব্র ক্লান্তি আর তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে যখন চালক গতির ঝড় তোলে, তখন নিমেষেই ঘটে যায় একেকটি ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ। অনেক সময় খরচ বাঁচাতে অদক্ষ হেলপারদের হাতেও দূরপাল্লার বাসের চাবি তুলে দেওয়া হয়। প্রতিটি লাশের বিনিময়ে তাদের পকেটে যে রক্তমাখা টাকা জমা হয়, তার বিচার করার মতো শক্ত আইনি কাঠামো কি আমাদের আছে?

অবশ্যই চালক এবং সাধারণ যাত্রীদের অসচেতনতাও এই ট্র্যাজেডিতে ঘি ঢালে। মহাসড়কে আগে যাওয়ার বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা এবং সাধারণ যাত্রীদের বাধ্য হয়ে বা অসচেতনভাবে বাসের ছাদে কিংবা ট্রাকে চড়ে যাতায়াত করার প্রবণতা মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সড়কের এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে কেবল তদন্ত কমিটি গঠন আর প্রতিশ্রুতির রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। বিআরটিএ-কে দুর্নীতিমুক্ত করে চালকদের কঠোর প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে, ফিটনেসবিহীন গাড়ির স্ক্র্যাপ নিশ্চিত করতে হবে এবং অতিরিক্ত মুনাফালোভী পরিবহন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। উৎসবের আনন্দ যেন কোনো পরিবারের আজীবনের কান্নায় পরিণত না হয়, সেজন্য এখনই সম্মিলিত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া দেখতে চাই না, রাজপথ হোক নিরাপদ।

প্রতিদিনের খবরের কাগজের নির্মম বাস্তব চিত্র। আমাদের সড়কগুলো আজ কসাইখানায় পরিণত হয়েছে, যেখানে ঘাতকদের বিচার হয় না, শুধু প্রতি বছর যোগ হয় নতুন কিছু লাশের সংখ্যা। উৎসবের আনন্দ এভাবে আর কতকাল কান্নায় রূপ নেবে?

১৫১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন