ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ: ১০ কেজির স্থলে মিলছে সাড়ে ৮–৯ কেজি
বৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ, ২০২৬ ১২:০৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
নরসিংদী পৌরসভায় ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগীদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ১০ কেজি চালের পরিবর্তে বিশেষ ধরনের বালতি ব্যবহার করে কৌশলে এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত কম চাল দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে বুধবার ও বৃহস্পতিবার সরেজমিনে নরসিংদী পৌরসভায় গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮টার আগেই শত শত নারী-পুরুষ চাল নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। চাল বিতরণস্থলে সারি সারি করে চালের বস্তা রাখা হয়েছে এবং কিছু বস্তা খুলে চাল নিচে ঢেলে রাখা হয়েছে। পাশেই রাখা রয়েছে পাঁচটি টিনের বালতি—একটি নীল রঙের এবং বাকি চারটি সাদা।
সকাল ৮টা থেকে পৌর কর্তৃপক্ষ চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে। লাইনে দাঁড়ানো উপকারভোগীরা ভিজিএফ কার্ড জমা দিয়ে ১০ কেজি চাল প্রাপ্তির তালিকায় টিপসই দিয়ে চাল নিয়ে যাচ্ছেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, মাপার যন্ত্র ব্যবহার না করে বালতি দিয়ে মেপে চাল দেওয়ায় অনেকেই ১০ কেজির পরিবর্তে সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে ৯ কেজি চাল পাচ্ছেন।
চাল বিতরণে নিয়োজিত মো. মতিউল্লাহ বলেন, “আমরা বস্তাপ্রতি চাল কম পাই। তাই সাড়ে ৯ কেজি করে চাল দিচ্ছি। এর বেশি দেওয়ার সুযোগ নেই।”
তবে প্রতিবেদক পৌর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কয়েকটি বস্তা র্যান্ডমভাবে মেপে দেখেন, প্রতিটি বস্তায় সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনশ গ্রাম চাল কম রয়েছে। অথচ উপকারভোগীরা অভিযোগ করছেন, তারা ১০ কেজির বিপরীতে এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত কম পাচ্ছেন।
৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সামসুন্নাহার বলেন, “১০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা। কিন্তু বাড়িতে এনে মেপে দেখি প্রায় এক কেজি কম। তারা সব সময় গরিবের হক মেরে খায়। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের ন্যায্য অধিকার না পেলে কার কাছে যাব?”
৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হাজেরা বেগম বলেন, “দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করে চাল নিয়েছি। বাড়িতে গিয়ে সন্দেহ হলে দোকানে মেপে দেখি মাত্র ৮ কেজি ৮শ গ্রাম চাল রয়েছে। অথচ আমাকে ১০ কেজি দেওয়ার কথা ছিল।”
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান জানান, নরসিংদী পৌরসভার ৪ হাজার ৬২৫ জন সুবিধাভোগীর জন্য জন প্রতি ১০ কেজি করে চাল বরাদ্দ রয়েছে। সোমবার (৯ মার্চ) থেকে চাল বিতরণ শুরু হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) তা শেষ হওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজারের বেশি উপকারভোগী চাল গ্রহণ করেছেন। তবে চাল কম দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এলাকার সচেতন মহলের দাবি, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারের ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় জন প্রতি ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই পাচ্ছেন সাড়ে ৮ থেকে ৯ কেজি। যদি প্রতি উপকারভোগীর কাছ থেকে এক কেজি করে চাল কম দেওয়া হয়, তবে মোট ৪ হাজার ৬২৫ কেজি চাল অবশিষ্ট থাকে, যা প্রায় ১৫৪ বস্তার সমান। এই চাল পরে কৌশলে আত্মসাৎ করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিন বলেন, “আমাদের গুদাম থেকে যে চালের বস্তাগুলো নির্ধারিত গন্তব্যে যায়, সেগুলোতে চাল কম থাকার সুযোগ নেই। তবে প্রতি বস্তায় ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম এদিক-সেদিক হতে পারে। চাল কম দেওয়ার বিষয়টি বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।”
এ বিষয়ে নরসিংদী পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (গোপনীয় শাখা) এফ এম নাঈম হাসান শুভ বলেন, “প্রতিটি সুবিধাভোগীর জন্য বরাদ্দকৃত ১০ কেজি চাল সবসময় আসে না। বিভিন্ন পৌরসভায় খোঁজ নিয়ে একই অবস্থা পাওয়া গেছে। তবে ৯ কেজি ৫০০ গ্রামের নিচে চাল দেওয়ার সুযোগ নেই।”
নরসিংদী জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, “আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। সংশ্লিষ্ট পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
১৩৬ বার পড়া হয়েছে